স্কুলজীবন

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী আবুল মাল আবদুল মুহিতের শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলো ছিল হাসি-খুশি আর আনন্দে ভরা। গৃহ শিক্ষকের কাছেই পড়ালেখায় হাতেখড়ি আর সিলেট গভর্নমেন্ট হাই ইংলিশ স্কুলে (বর্তমানে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুল) তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনে প্রবেশ। ১৮৪১ সালে স্থাপিত এটিই সিলেট শহরের প্রাচীনতম স্কুল- যে স্কুলে মুহিতের ভাই-বোনদের প্রায় সবাই এমনকি বাবা, দাদা, পরদাদাও পড়াশোনা করেছেন। তাঁর দাদা খান বাহাদুর আবদুর রহিম এ স্কুলে দু’বছর শিক্ষকতাও করেছিলেন।

সিলেট গভর্নমেন্ট হাই ইংলিশ স্কুলে মুহিতের ভাই চতুর্থ শ্রেণি এবং মুহিত তৃতীয় শ্রেণির জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁর ভাইকে নিলেন ক্লাস থ্রিতে আর মুহিতকে ফিরিয়ে দিলেন। কেননা পরীক্ষার দু’টি বিষয় শ্রুতিলিখন ও অংক, দু’টিতেই তিনি পাস করলেন না; শ্রুতিলিখনেতো পেলেন লাড্ডু! এর কারণ- পরীক্ষা দেয়ার বিষয়টি তাঁর মোটেই জানা ছিল না। গৃহশিক্ষক মুখে মুখে পরীক্ষা নিতেন, কিন্তু খাতা-কলমে নিতেন না। তাই পরীক্ষার খাতায় কীভাবে লিখতে হবে, তা না বুঝতে পারাতেই তাঁর এই ফল- বিপর্যয়। মুহিতের আব্বা ছেলের মেধা সম্পর্কে ভালোভাবে জানতেন বিধায় তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে গিয়ে বললেন, আপনিত’ আমার মেধাবী ছেলেটিকে বাদ দিয়ে দিলেন। প্রধান শিক্ষক মুহিতের ভর্তি পরীক্ষার প্রসঙ্গে বলায় তাঁর আব্বা বললেন, সেত’ বাসায় স্কুলের মতো করে পড়ালেখা করেনি। তখন প্রধান শিক্ষক জানতে চাইলেন- মুহিত কোন্ বিষয়ে ভালো? তাঁর আব্বা বললেন, ইংরেজিতে ভালো।

হেড মাস্টার সাহেবের পরামর্শ অনুযায়ী মুহিতকে একদিন তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন মুহিতের আব্বার মুহুরী আবদুর রাজ্জাক সাহেব। হেড মাস্টার মুহিতকে দেখে ইংরেজিতে প্রশ্ন করলেন- What’s your father? মুহিত বললেন- My father is a pleader. সাধারণত এরকম প্রশ্ন করলে অন্য ছেলেরা Father এর নাম বলে, কিন্তু মুহিত উত্তর সঠিক দেয়ায় দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন না করে ভর্তির অনুমোদন দিলে মুহিত এবং তাঁর বড় ভাই দু’জনই একই ক্লাসে ভর্তি হয়ে গেলেন।

মুহিতদের স্কুলে একটা অদ্ভুত Democracy ছিল। প্রায় সব ছাত্রই খালি পায়ে স্কুলে যেত। কিন্তু তারা দু’ভাই শার্ট ইন করে, জুতা-মোজা পরে স্কুলে যেতেন। হাতে গোনা আরও ক’জনও এইরকম পোশাক পরতো। এটা নিয়ে ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে হাসাহাসি হতো, মাঝেমধ্যে ছেলেরা দু’ভাইয়ের জুতা-মোজা খুলে নিত। অগত্যা দু’বছর পর তাঁরাও পরিপাটি ড্রেস ছেড়ে দিয়ে সবার মতো করে স্কুলে আসা-যাওয়া শুরু করলেন।

মুহিতদের ছোটবেলায় লেখার জন্যে দোয়াতের কালি এবং পালকের কলম ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু মুহিত এটাকে সামাল দিতে পারতেন না, কাপড়-চোপড়ে কালি লেগে যেত। তাই প্রায় প্রতিদিনই বাসায় ফিরলে বুবুর বকাবকি শুনতে হত। বকাবকি করলেও বুবুই প্রতিদিন কাপড়-চোপড় ঠিক করে দিতেন।

তৃতীয় শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার জন্যে মুহিত হেলাফেলা করে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলেন ঠিকই, কিন্তু রেজাল্ট ভালো হলো না। মুহিতের পজিশন ১৬ নম্বরে; আর তাঁর ভাই ৯ কি ১০ নম্বরে স্থান পেলেন। রেজাল্ট শুনে মুহিতের আব্বা তাঁকে বেশ বকাঝকা দিলেন। মুহিত ভাবলেন সব সাবজেক্টে ৮০ বা তার কাছাকাছি নম্বর পেয়ে পাস করেছি; তারপরও আব্বা কেন বকাবকি করছেন, সে হিসাব মুহিত কোনোভাবেই মিলাতে পারছিলেন না। আসলে পরীক্ষা মানে যে কম্পিটিশন -এটা মুহিতের মাথায় তখনও ঢোকেনি।

চতুর্থ শ্রেণিতে উঠে মুহিতের একটা যুগান্তকারী Experience হলো। তাদের শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম জানালেন- ডিপিআই সাহেব তাঁদের স্কুল পরিদর্শন করবেন; তিনি এলে বিভিন্ন ক্লাসে ঘুরবেন, ছাত্রদেরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করবেন। এজন্য শিক্ষকগণ ছাত্রদেরকে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তিনি মুহিতকে এও বললেন- তুমি ইংরেজি বক্তৃতার কথা চিন্তা করে রাখো। যদি সুযোগ পাই,তাহলে ডিপিআই সাহেবকে বলবো তোমার বক্তৃতা শুনতে। যথারীতি মুহিত মনে মনে বক্তৃতার বিষয় ঠিক করে রাখলেন।

ডিপিআই সাহেব এলেন, যথারীতি ইন্সপেকশন হয়ে গেল। তখন শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম ডিপিআই সাহেবকে বললেন- স্যার, আমার ক্লাসে একজন ছাত্র আছে, যে ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারে। আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে তাকে ডাকতে পারি। একটু নার্ভাস হলেও মুহিত ভরসা পেলেন এ কথা ভেবে যে, ডিপিআইএ’র সঙ্গী ইন্সপেক্টর সাহেব তার পরিচিত; তাঁকে তিনি দাদা বলে ডাকেন। মুহিত ডিপিআই সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে গট্গট্ করে ইংরেজিতে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। সেদিন থেকে মুহিত খুব বিখ্যাত হয়ে গেলেন। স্কুলে মুহিতের কদরও রাতারাতি বেড়ে গেল। সারা স্কুলই এখন জানলো যে মুহিত ইংরেজিতে ভালো।

ক্লাস ফাইভে শ্রেণি শিক্ষক সারা ক্লাসের ছাত্রদের দুইভাগে ভাগ করলেন নিয়মিতভাবে পড়াশোনায় প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। দল হলো ক্লাসে ডানে যারা বসে তাদের একটি, আর অন্যটি বামে যারা বসে। তখন মুহিত ছিলেন বাম দলে; আর এই দলের অন্য এক সদস্য ছিলেন সুখময় চক্রবর্তী। পরবর্তীকালে তিনি ভারতের নামকরা অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক হন এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি মাত্র ৬০ বছরের কম বেঁচেছিলেন। তাঁদের দলে যেসব ছাত্র লেখাপড়ায় দুর্বল ছিল তাদের রীতিমতো কোচিং করাতে ব্রত হন দুই বন্ধু। দুর্বল ছাত্ররা এই সুযোগে তাঁদের প্রায় গুরুর মতো মনে করতো, ছুটির দিনেও পড়াশোনার জন্য বাড়িতে আসতো।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় সদরুদ্দিন চৌধুরী ক্লাস-ক্যাপ্টেন ছিলেন। যিনি পরবর্তী জীবনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হন। ক্যাপ্টেন হিসেবে ভালোই ছিলেন, কিন্তু অনেক সময় দুষ্ট ছেলেদের ছাড় দিতেন; এটি মুহিতের পছন্দ ছিল না। তিনি আপত্তি করলে কর্তৃপক্ষ সদরুদ্দিনকে ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মুহিতকে ক্যাপ্টেন বানালেন। কিন্তু মুহিত ক্যাপ্টেন হিসেবে একেবারে ব্যর্থ! কারণ ক্যাপ্টেনদের অনেক কিছুতে কম্প্রোমাইজ করতে হয়; কিন্তু মুহিত কোনো কিছুতেই কম্প্রোমাইজ করতেন না। ফলে তিনি ব্যর্থ ও আন-পপুলার হলেন এবং ক্যাপ্টেনশীপ থেকে পদত্যাগ করলেন। প্রতিজ্ঞা করলেন আর কোনোদিন ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব নেবেন না। ফলশ্রুতিতে সদরুদ্দিন আবার ক্যাপ্টেন হলেন। কেননা, সারাক্লাসে তিনিই ছিলেন এ বিষয়ে সবচেয়ে উপযুক্ত এবং তিনি এই দায়িত্ব সপ্তম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পালন করেন।

মুহিত ক্লাস এইটে রেজাল্টটা একটু ভালোই করলেন। এ সময় তিনি হাজী মোহাম্মদ মহসীন স্কলারশীপ পেলেন। ৪ বছর এ বৃত্তি চলল। দু’বছর ৩ টাকা করে, পরবর্তী দু’বছর ৪ ও ৫ টাকা করে। মুহিত বৃত্তির টাকা খরচ না করে তার সেভিংস একাউন্টে জমা করলেন। ১৯৪৫ সালে ৭ম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালীনই তাঁর নামে সেভিংস একাউন্ট খোলা হয়েছিল, যা প্রথমে অভিভাবকের সহায়তায় অপারেট করা হতো। পরে ঢাকায় পড়ার সময় নিজে অপারেট করা শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন মুহিত। অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেশের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত যেমন তাঁকে নিতে হয়, তেমনি সলিমুল্লাহ হলে সহপাঠীদের অনেকের জন্য টাকা ধার পাওয়ার উৎস ছিলেন মুহিত। অর্থাৎ প্রাকৃতিকভাবে শৈশব থেকেই অর্থমন্ত্রী হওয়ার পাঠ শুরু হয়েছিল মুহিত’র। তিনি প্রতি মাসে ৮০ টাকা পেতেন বাবার কাছ থেকে, যা দিয়ে হেসে খেলে মাস চলে যেত তাঁর। এই টাকা থেকেই তিনি অন্যদের ধার দিতেন। তবে শর্ত ছিল, কেউ একবার টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দিলে, তিনি তাকে আর ধার দিতেন না। ফলে তাঁর কাছ থেকে টাকা ধারকারীরা তাঁকে টাকা ফেরত দিয়ে দিত; যাতে অর্থ প্রাপ্তির এমন উৎস নষ্ট হয়ে না যায়। এমনকি মুহিত অন্যের প্রয়োজনে অনেক সময় হাউজ টিউটরের কাছ থেকে নিজে টাকা ধার করে তারপর ধার দিতেন। আবার টিউটরকে তা ফেরত দিয়ে দিতেন যথাসময়ে। এভাবেই আজকের অর্থমন্ত্রী ছাত্রজীবনেই ছিলেন অনেক সহপাঠীর অর্থ সংক্রান্ত বিপদের বন্ধু।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় শিক্ষকদের মূল্যায়নে দেখা গেল- মুহিত অংকে একটু কাঁচা। অন্যান্য বিষয়ে প্রায়ই সর্বোচ্চ নম্বর অথচ অংকে কম নম্বর -এটা মেনে নেয়া যায় না বিধায় হেড মাস্টার সাহেব মুহিতের জন্য বিশেষ কোচিংয়ের ব্যবস্থা করলেন। ফলশ্রুতিতে তিনি অংকেও পারদর্শী হয়ে উঠলেন। ক্লাস নাইন থেকে টেন এ ওঠার সময় মুহিত সেকেন্ড হলেন আর প্রথম হলেন ভবানী শংকর। এরপর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন ১৯৪৯ সালে; স্কুল থেকে ৮৮ জন ছাত্র পরীক্ষা দিল, মুহিতের পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল রাজা গিরিশ চন্দ্র হাইস্কুল। তখন সারা সাবডিভিশনে একটা সেন্টারেই পরীক্ষা হতো। মুহিতের বন্ধু-বান্ধবদের খুব আশা ছিল যে, তিনি খুব ভালো রেজাল্ট করবেন। হেড মাস্টার আব্দুল গফুর চৌধুরী (প্রাক্তন চীফ জাস্টিস মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর বাবা) -উনি নিশ্চিত ছিলেন মুহিতের একটা প্লেস থাকবে, কিন্তু রেজাল্ট ভালো হলো না। অংক আর ইতিহাসে লেটার মার্কসহ শুধু ফার্স্ট ডিভিশন; এতে সবাই হতাশ হলেও মুহিত ভেঙে পড়েননি। মার্কশিট এলো- দেখা গেল মুহিত ভালোই করেছেন। মুহিত সেই সেন্টারে প্রথম হলেও এডিশনাল ম্যাথমেটিক্সে ৩০ মার্কের পর তাঁর মাত্র ১৮ মার্ক যোগ হওয়ায় এ ফলাফল বিপর্যয়।

মুহিতের জীবন বৃত্তান্ত

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী দেশের কৃতী সন্তান এ এম এ মুহিত দেশের প্রয়োজনে তাঁর কর্মকৌশল, মেধা, সততা, দক্ষতা ও সেবা দেখিয়ে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করছেন। সিলেটের এ সুসন্তান দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেছেন
বিস্তারিত...

যোগাযোগ

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা
১৩ তলা, ঢাকা -১০০০
ফোনঃ ৯৫৬০২২৫, ৯৫৫০০৫৫,
ই-মেইলঃ info@campus.org.bd

মেইল করুন